Breaking News
Home / সকল খবর / অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই বাংলাদেশকে ভারতের বিরোধিতা করতে হবে
loading...

অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই বাংলাদেশকে ভারতের বিরোধিতা করতে হবে

তাজউদ্দীন: বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা, সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভারতের আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন নাগরিকদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ি এমনিতেই ছোট রাষ্ট্রগুলোর উচিৎ বড় রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতা করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। মাৎস্যন্যায়ের তত্ত্ব অনুযায়ি বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়। বড় রাষ্ট্রগুলো বা ক্ষমতাশালীরা ছোট রাষ্ট্র বা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাশালীদের আনুগত্যে রাখতে চায়, ডমিনেট করতে চায়, ভোগ করতে চায় ও সময়মতো করায়ত্ত করে অঙ্গরাজ্যে পরিণত করতে চায়। সুতরাং, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে এবং তিনদিক থেকে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা দেশ হিসেবে দিল্লীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে।

গত ৮ বছর ধরে ভারত যেভাবে বাংলাদেশকে গিলে খেতে শুরু করেছে, যেভাবে একের পর এক ভারত তার স্বার্থ হাতিয়ে নিচ্ছে; তাতে বাংলাদেশ নামক দেশটি সিকিম বা হায়দ্রাবাদে পরিণত হওয়ার পথে তেমন বাকি নেই।

অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে সমস্যা দূর না হতেই ভারত বিনা শুল্কে বা নামমাত্র শুল্কে ট্রানজিট পেয়ে গেছে। বিশ্ব ঐতিহ্য খ্যাত সুন্দরবনকে ধ্বংস করে তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে বাংলাদেশে, যেটা বাংলাদেশের জন্য প্রাকৃতিকভাবে এবং আর্থিকভাবে অলাভজনক ও ক্ষতিকর। শুষ্ক ও খরা মৌসুমে নদীর পানি আটকে রাখছে ভারত। তাতে বাংলাদেশ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। কৃষিকাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। নদীর পানি না পাওয়ায় ভিন্নভাবে পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে পণ্য উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় বেড়ে গেছে। আর এ সুযোগে ভারতের পণ্য বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিচ্ছে। আর ভরা বর্ষায় ভারত বন্যা থেকে রক্ষা পেতে ফারাক্কা ও গজলডোবার মতো বাঁধগুলোর গেট খুলে দিয়েছে। তাতে করে বাংলাদেশের মানুষ পানিতে ডুবে মরছে। বন্যায় একাকার হয়ে গেছে পুরো উত্তরবঙ্গ। সীমান্ততো এখন রক্তের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিএসএফ একের পর এক বাংলাদেশিদের হত্যা করছে, নির্যাতন করছে। সীমান্তের লোহার তৈরি কাঁটাতারগুলো যেন রক্তের আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশের তিনপাশে রয়েছে ভারতের মত একটি সম্প্রসারণবাদী মানসিকতার শিল্পোন্নত রাষ্ট্র। সে পৃথিবীর নবমতম শিল্পোন্নত দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিও বটে। ভারতের ক্রমপ্রসরমান শিল্প-বাণিজ্যের অগ্রগতির প্রভাব অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশ কি করে তার নিজস্ব একটি অর্থনীতি নির্মাণ করবে? যেখানে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি দারুণ ব্যবসায়িক টেরিটোরি। এই জিনিসটি আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামীজোট ভারতপ্রীতি দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। একটি স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্রের নিজস্ব একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বুনিয়াদ তৈরি করার প্রয়াস জোটটি গ্রহণ না করে উল্টো অবৈধ ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিচ্ছে। এ সুযোগে ভারত লুটপাটের আখরায় পরিণত করেছে বাংলাদেশকে।

একটা স্বনির্ভর দেশ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হলে আমাদের অবশ্যই ভারতের আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে হবে। তারমানে কোন হিন্দু ভাইয়েরা মনে করবেন না যে ভারত বিরোধিতা মানেই হিন্দু বিরোধিতা। বা আপনি হিন্দু বলেই অন্ধভাবে ভারতের পক্ষে থাকবেন। মনে রাখতে হবে সবার আগে দেশ।

বিশ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের বক্তৃতায় সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে বাংলাদেশের কী ধরণের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক ক্ষতি হবে তার তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন। এসব তথ্য প্রথিতযশা ও বিজ্ঞ পরিবেশবাদী ও অর্থনীতিবিদগণও তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাতে কোনভাবেই কর্ণপাত করছে না শেখ হাসিনা সরকার। তাদের কাছে ভারতের সমর্থনে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে রাখাটাই ধর্তব্য। আর ভারত এ সুযোগে গনেশ উল্টে দে মা লুটেপুটে খাই অবস্থায় লুণ্ঠন চালাচ্ছে।

রাজনীতি বা স্বাধীনতার কথা বাদ দিলেও সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ছোটদেশকে তার নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনেই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বড়দেশের বিরোধিতা করতে হয়। এর মধ্যে সংকীর্ণতা কিংবা হীনমন্যতা খোঁজার কোন অবকাশ নেই। বন্ধুত্বের উদারতাও এক্ষেত্রে মুৎসুদ্দিরই নামান্তর। ছোটদেশকে তার নিছক ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে বৃহত্তর প্রতিবেশির প্রতিবন্ধকতার জাল ছিন্ন করতে হয়। যে জাতি ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করা শেখেনি তাকে বড় দেশের লেজুড় হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়।

loading...

এক্ষেত্রে বিএনপিসহ বিরোধীজোটের নেতাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রয়োজনে ক্ষমতা থেকে দূরে থেকে হলেও ভারতের আগ্রাসন রোধে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে। ভারতের সাথে নিজের দেশের ক্ষতি হয় এরকম চুক্তির বিষয়ে সমঝোতা করে ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করার চিন্তাও করা যাবে না। তাহলে রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত শেষ হয়ে যাবে। যারা বিএনপিকে সমর্থন দেয় তারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চিন্তন থেকেই সমর্থন দেয়। ভারত বিরোধিতার কারণেই দলটির এতো জনপ্রিয়তা। সুতরাং জনগণের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে। জনগণের শক্তিই বড় শক্তি। তাতে হয়তো ক্ষমতায় আসতে কিছুটা দেরি হতে পারে। তবে সে দেরি জনগণ মেনে নিবে দেশের স্বার্থে। এরমানে এটা বলছি না যে, কোন কারণ ছাড়াই ভারত বিরোধিতা করতে হবে। বা ভারতের সাথে শত্রুতা করে চলতে হবে। ভারতের সাথে বন্ধুত্ব থাকবে সমতা, বৈষম্যহীনতা ও ভারসাম্যতা বজায় রেখে।

বিদগ্ধ দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক আহমদ ছফা এ বিষয়ে বলেছেন, নিছক শত্রুতা, নিছক ঘৃণা, নিছক বিরোধিতা– এগুলো কোন কাজের কথা নয়। অন্ধকারের শক্তির ওপর আস্থাস্থাপন করলে রসাতলে যাওয়ার পথটাই পরিষ্কার হয়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক কল্যাণকামনা– এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির উজ্জীবনের প্রশ্নে বড়দেশের বিরোধিতা করা একটি স্বাস্থ্যকর লক্ষণ।

তাইওয়ান যদি মূল চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করত তো এত দ্রুত তার অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটত না। কোরিয়া জাপানের পার্শ্ববর্তী একটি অসহায় দেশ ছিল। শিল্পোন্নত জাপানের কাছে নতিস্বীকার না করে নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াবার সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কারণে আজকের পৃথিবীতে কোরিয়া একটি সম্মানজনক স্থান অধিকার করতে পেরেছে।

ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করার জন্য একটি নিজস্ব অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। নইলে ক্রমসম্প্রসারমাণ ভারতীয় শিল্পবাণিজ্যের চাপে ও আগ্রাসনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান সুদূর পরাহত হয়ে দাঁড়াবে। বরঞ্চ ক্রমশ ধ্বসে পড়বে। নতজানু হয়ে পড়বে সব ব্যবস্থা। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের গর্ব করার মতো অনেক বিষয় রয়েছে। যা এককভাবে বাংলাদেশেরই রয়েছে।

বাংলাদেশিরাই একমাত্র জাতি যে জাতি একক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পেরেছে। ইতিহাসে আর কোন উদাহরণ নেই। অনেকে শশাঙ্কের কথা বলেন বটে কিন্তু শশাঙ্ক বাঙালিই ছিলেন না। যদিও কোন কোন শাসক ভারতবর্ষের দিল্লীকেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতিকূলে এখানে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছেন। কিন্তু তাদের কেউই বাংলার মাটির সাক্ষাৎসন্তান ছিলেন না। আমরাই একমাত্র জাতি যারা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে অর্জন করেছি। আমরা ৯ মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন পতাকা ও মানচিত্র অর্জন করেছি।

উপমহাদেশের অন্য দুটি রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে অধিকতর রাষ্ট্রবিজ্ঞানসম্মত আধুনিক রাষ্ট্র বলে মেনে নিতে হয়। ভারত কিংবা পাকিস্তানকে জাতীয় রাষ্ট্র বলা যাবে না। ভারত রাষ্ট্র বটে কিন্তু ভারতীয় জাতি বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। এ কথা ভারতীয় চিন্তানায়করাই বলতে আরম্ভ করেছেন। বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্র এবং জাতিও বটে।

এই রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়াটিও লক্ষ করার মত। বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ঘটনা ভারতবর্ষের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের পরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভাষা আন্দোলনের জন্ম নিয়েছে। বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের অনুকরণে ভারতের আসাম, পাঞ্জাব এবং কাশ্মীর ইত্যাদি রাজ্যে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর আজও স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করছে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। এসব রক্ত দিয়ে অর্জন করা স্বাধীনতার প্রথম পথিকৃৎ এ উপমহাদেশে বাংলাদেশ নামক দেশটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কাশ্মীরের জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছে।

আজকের যেটা বাংলাদেশ সেটা একসময়ে অবিভক্ত ভারতের অন্তর্গত অখণ্ড বাংলার অংশ ছিল। তারপরে এই অঞ্চল পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই প্রতিটি বিভাজনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ নিজস্ব একটা স্বতন্ত্র চরিত্র অর্জন করেছে। আমরা পাকিস্তানের অংশ নই বলে যেমন গর্ববোধ করি। একই কারণে ভারতীয় ইউনিয়নের একটি অন্তর্ভুক্ত রাজ্য নই বলেও আমাদের গর্বের অন্ত নেই। আমরা যেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত না হই।

সে অপচেষ্টাই চালাচ্ছে আওয়ামীজোট। তাই জনগণকেই সোচ্চার হতে হবে। সুন্দরবনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে দেয়া যাবে না। অভিন্ন নদীর হিস্যা আদায় করতে হবে। ফারাক্কাসহ সব বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে।

loading...

Check Also

আওয়ামীলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগদান

আওয়ামীলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগদান

আওয়ামীলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগদান করেছেন। শক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সদর উপজেলা বিএনপির কাযার্লয়ে …

Leave a Reply